বিবেকের কারবালাঃ এক নিঃসঙ্গ আহ্বান ও উম্মাহর অনন্ত ঋণ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
বিবেকের কারবালাঃ এক নিঃসঙ্গ আহ্বান ও উম্মাহর অনন্ত ঋণ

ইতিহাস কেবল অতীতের স্তূপ নয়, বরং এটি বর্তমানের আয়না। কারবালার তপ্ত বালুকা প্রান্তরে নবী-দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সেই আর্তনাদ—“হাল মিন নাসির ইয়ানসুরুনা?” (কেউ কি আছে, যে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে?)—কোনো সামরিক সাহায্যের প্রার্থনা ছিল না। এটি ছিল মানবাত্মার মুক্তির জন্য এক আধ্যাত্মিক ও চিরন্তন আহ্বান। শতাব্দী পেরিয়ে আজও যখন মজলুমের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারি হয়, আর মুসলিম উম্মাহর নির্লিপ্ততা প্রকাশ পায়, তখন আলী লারিজানির সেই বেদনাদায়ক উক্তি—"একটি দেশও আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি"—কারবালার সেই একাকীত্বকেই পুনর্জীবিত করে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং মুমিন হৃদয়ের গভীর ক্ষত।

সত্যের পথে অবিচলতা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্যের পতাকাবাহীদের সাহায্য করতে। এর আধ্যাত্মিক (ইশারি) ব্যাখ্যা হলো, সত্য যখন একাকী হয়ে পড়ে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত ইমান।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا أَنصَارَ اللَّهِ

(সূরা আস-সাফ, আয়াতঃ ১৪)

অনুবাদঃ হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও।

আল্লাহ তায়ালা অভাবমুক্ত, তবুও তিনি তাঁর বন্ধুদের (আউলিয়া) মাধ্যমে আমাদের ইমান পরীক্ষা করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন ‘সরকার-এ-খোদা’ বা আল্লাহর খলিফা। তাঁকে সাহায্য করার অর্থই ছিল খোদ আল্লাহকে সাহায্য করা। যারা সেদিন নীরব ছিল, তারা আসলে নফস বা কুপ্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়ে আল্লাহর নূরকেই প্রত্যাখ্যান করেছিল।

এক অবিভাজ্য সত্তা
রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মাহকে একটি অবিভাজ্য দেহের সাথে তুলনা করেছেন। যখন সেই দেহের কোনো অঙ্গ রক্তাক্ত হয়, তখন পুরো শরীরের ব্যথিত হওয়া আবশ্যক।

المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا

(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

অনুবাদঃ এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য ইমারত সদৃশ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।

এই হাদিসের গূঢ় রহস্য হলো আধ্যাত্মিক সংহতি। ইমাম হুসাইন (আ.) যখন ইয়াজিদের বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি উম্মাহর এই আত্মিক ইমারতকে রক্ষা করতেই নিজের রক্ত দিয়েছিলেন। আজ যখন কোনো মজলুম জাতি সাহায্যের জন্য আর্তি জানায়, আর উম্মাহ স্বার্থের কারণে নীরব থাকে, তখন সেই ইমানি ইমারত ধসে পড়ে।

নিঃসঙ্গতার আধ্যাত্মিকতা
আহলুল বাইয়েতের (আ.) জীবনদর্শন হলো ত্যাগের পরাকাষ্ঠা। মাওলা আলী (আ.) বলতেন, "সত্যের পথে চলতে গিয়ে একাকীত্বে ভীত হয়ো না, কারণ সেই পথে পথিকের সংখ্যা খুবই কম।" কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সেই নিঃসঙ্গ আহ্বান আসলে স্বার্থপর দুনিয়ার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক বিদ্রোহ।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর দর্শনে, কারবালা কোনো নির্দিষ্ট দিন বা স্থান নয়—বরং যেখানেই জুলুম, সেখানেই কারবালা। সুফি সাধক মাওলানা রুমি (রহ.)-এর মতে, ইমাম হুসাইন (আ.) হলেন ‘সুলতানুল ইশক’ বা প্রেমের সম্রাট। তিনি যখন সাহায্য চেয়েছিলেন, তিনি আসলে চেয়েছিলেন মানুষ যেন তাদের নফসের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে খোদায়ী প্রেমে জাগ্রত হয়।

শামস তাবরিজি (রহ.)-এর দর্শন অনুযায়ী, যারা মহান আল্লাহর প্রেমে মত্ত, তারা একাকীত্বকে ভয় পায় না। কিন্তু উম্মাহর জন্য সেই নিঃসঙ্গ সংগ্রামীকে একা ফেলে রাখা এক বিশাল ঋণ। ইমাম গাজ্জালির ভাষায়, এটি হলো ‘হুব্বুদ দুনিয়া’ বা দুনিয়ার মোহ, যা মানুষের হৃদয়কে পাষাণ করে দেয়। আজ যখন আমরা দেখি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থের চাদর মুড়ে বসে আছে, তখন বোঝা যায় আমরা ‘তাজকিয়াতুন নাফস’ বা আত্মশুদ্ধি থেকে কতটা দূরে সরে গেছি।

আধ্যাত্মিক জাগরণ
কারবালার সেই ধূলিধূসরিত প্রান্তর থেকে আজও একটি আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই ডাক কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, বরং এটি প্রতিটি যুগের মুমিনের জন্য এক পরীক্ষা। আলী লারিজানির সেই খেদোক্তি আমাদের বিবেকের আয়নায় এক করাঘাত। স্বার্থের চাদর মুড়ে ঘুমিয়ে থাকা উম্মাহকে আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি ইমানের দাবি রক্ষা করবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় নীরব অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে?

আসুন, আমরা আমাদের হৃদয়ের কারবালায় হুসাইনি চেতনাকে জাগ্রত করি। ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়াই। মনে রাখবেন, যদি আমরা আজও নিঃসঙ্গ সংগ্রামীদের একাকী ফেলে রাখি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না এবং খোদাপ্রেমের পথে আমাদের যাত্রা কখনোই সফল হবে না।

ডাক এখনো একই... কেউ কি আছে, যে দাঁড়াবে?
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default